রংপুরে সবজির দাম কমলেও চাল-মাংস-ডিমে হিমশিম খাচ্ছেন ক্রেতারা

রংপুর ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪৫ রংপুরের খুচরা ও পাইকারি বাজারগুলোতে গত তিন মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নানা পরিবর্তন দেখা গেছে। আগস্টের শেষ দিক থেকে সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত শাকসবজি, মাছ, মাংস, চাল, ডাল ও মসলাজাতীয় পণ্যের দামে যেমন ওঠানামা হয়েছে, তেমনি কিছু পণ্যের দাম স্থিতিশীলও রয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাসের শেষ সপ্তাহগুলোতে ক্রয়ক্ষমতা ও চাহিদা কমে যাওয়ায় সাধারণত কিছু পণ্যের দামে স্বস্তি মেলে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ সংকটে দাম বাড়ে। সামগ্রিকভাবে মাছ, মাংস ও চালের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের বেশির ভাগের পকেটে টাকা থাকছে না।
আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রংপুরের সবজির বাজারে শীতকালীন সবজির আগমনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। টমেটো, গাজর ও আলুর দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
২৫ আগস্ট কার্ডিনাল আলু ২২-২৫ টাকা, সাদা আলু ৩৫-৪০ টাকা এবং লাল পাকড়ি আলু ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে কার্ডিনাল ২০-২৫ টাকা ও সাদা আলু ২৫-৩০ টাকায় নামে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এসে কার্ডিনাল ১৮-২০ টাকা এবং দেশি সাদা আলু ২০-২৫ টাকা কেজিতে নেমেছে।
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ১২০-১৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া টমেটো ও গাজরের দাম অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বেড়ে ১৭০-১৮০ টাকায় পৌঁছালেও পরে কমে ১২০-১৪০ টাকায় স্থির হয়েছে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে কাঁকরোল ৪০-৫০ টাকা, ঝিঙা ৬০-৭০ টাকা এবং মুলা ৪০-৫০ টাকা কেজি ছিল। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কাঁকরোল ৫০-৬০ টাকা, ঝিঙা ৪০-৫০ টাকা এবং ফুলকপি ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বরবটি, পটল, ঢেঁড়স ও করলার দামে আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ১০ থেকে ২০ টাকার ব্যবধান দেখা গেছে।
শিমের দাম আগস্টে ১৫০-১৬০ টাকা থেকে সেপ্টেম্বরে ১৮০-২০০ টাকায় উঠলেও অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কমে ৮০-১০০ টাকায় নেমেছে।
সিটি বাজারের সবজি বিক্রেতা আলমগীর হোসেন বলেন, বাজারে এখন শীতকালীন সবজির আমদানি বেড়েছে। এ কারণে গত সপ্তাহের তুলনায় অধিকাংশ সবজির দাম কমেছে। দিন যত যাবে, দাম আরও কমবে।
স্টেশন বাজারের সবজি বিক্রেতা ইমরান হোসেন বলেন, মাসের শেষ সপ্তাহে সাধারণত সব ধরনের জিনিসপত্রের চাহিদা কম থাকে। এ কারণে বিক্রিও কম হয়। তাই বেশ কিছু সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় সামান্য কমেছে।
রংপুর নগরীর শাপলা চত্বরে খান বহুমুখী মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মশিউর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার চার সদস্যের পরিবারে এক হাজার টাকায় দুই দিনও যায় না। বেতনের কথা ভেবে হিসাব করে বাজার করতে হয়। কিন্তু খুব বেশি হিসাব করলে বাচ্চাদের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে হিমশিম খেতে হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পকেটে ২০ তারিখের পর আর টাকা থাকে না।
নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক রবিউল ইসলাম। সামান্য বেতন আর টিউশনের টাকায় বাজারের সঙ্গে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সিটি বাজারে বাজার শেষে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারে নিজেকে সবচেয়ে বেশি অসহায় মনে হয়। সবকিছুর দাম বেশি, কিন্তু বিক্রেতারা বলে কম। আমরা কোথাও কম দামে কিছু কিনতে পাচ্ছি না। ৪০ টাকার নিচে শীতকালীন সবজি নেই। পোলট্রির ডিম সস্তা ছিল বলে এত দিন অনেক গরিব পরিবার তা খেয়েছে। এখন এই খাদ্য জোগানোও বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে আমার মতো মানুষেরা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।
গত তিন মাসে কাঁচামরিচসহ মসলাজাতীয় পণ্যের বাজারে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে কাঁচামরিচের দাম ঘনঘন বদলেছে।
২৫ আগস্ট একদিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম ৬০-৭০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-১০০ টাকায় দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে তা ১২০-১৩০ টাকায় ওঠে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে কিছুটা কমে ৮০-১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তিন মাসজুড়েই দেশি পেঁয়াজ ৪৫-৫০ টাকা কেজি দরে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। আদার বাজারে তারতম্য দেখা গেছে। আগস্টে দেশি আদা ২২০-২৪০ টাকা থাকলেও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কিছুটা কমে ১৩০-১৬০ টাকার মধ্যে নেমে আসে। রসুন ও শুকনা মরিচের দাম আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় একই রকম ছিল, সামান্য ওঠানামা করেছে।
মুরগির বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, ডিম নিয়ে অসন্তোষ
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে মুরগির বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। মাসের শেষ সপ্তাহগুলোতে চাহিদা কম থাকায় বিক্রেতারা দাম কিছুটা কম রেখেছেন।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে ব্রয়লার মুরগি ১৭০-১৮০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও একই দাম ছিল। সোনালি মুরগি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ৩১০-৩২০ টাকা থেকে কমে ৩০০ টাকায় নামলেও অক্টোবরে আবার ৩১০-৩২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশি মুরগি ৫৪০-৫৭০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে।
গত তিন মাসে ডিমের বাজারে বড় পতন বা উল্লম্ফন দেখা যায়নি। আগস্টের শেষ সপ্তাহে পোলট্রি মুরগির লাল ডিমের হালি ছিল ৪৬-৪৮ টাকা, সেপ্টেম্বরের শেষে ৪৮-৫০ টাকা এবং অক্টোবরের শেষেও ৪৬-৪৮ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল।
তবু ডিম ও মুরগি নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগের শেষ নেই। অনেকে বলছেন, ডিমের দাম গরিবের নাগালের মধ্যে রাখা উচিত।
নগরীর লালবাগের একটি ছাত্রাবাসে থাকা বকুল চন্দ্র রায় বলেন, ডিম আকার ও সাইজভেদে কোথাও ৫০-৫২ টাকা, আবার কোথাও ৪৮ টাকা হালি। একটা ডিম ১২ টাকার নিচে নেই। অথচ ডিম সবচেয়ে সস্তা হওয়া উচিত। একটা ডিম ভেজে অন্তত একবেলা দুজন খাওয়া যায়। কিন্তু এখন ডিমও গরিবের জন্য কেনা কষ্টকর।
নগরীর মুলাটোল আমতলা বাজারের মুরগি বিক্রেতা আল আমিন বলেন, মাসের শেষ সপ্তাহে সাধারণত মুরগির দাম বাড়ে না। এবারও গত সপ্তাহের মতোই অপরিবর্তিত আছে।
ওই এলাকার বাসিন্দা ইকবাল সুমন বলেন, সাধারণ মানুষ শুধু আধা কেজি মাংস কিনতে ৩৫০-৪০০ টাকা খরচ করলে চাল-ডাল কিনবে কীভাবে? মধ্যবিত্তের জন্যও এখন মাংস খাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে। অথচ মাংস প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস। এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণিও প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারছে না। শুধু দামের কারণে মাসের এক-দুই দিন ছাড়া ভাতের প্লেটে মাংস জোটে না।
সিটি বাজার, মুলাটোল বাজার, ধাপ সিটি বাজার ও কামাল কাছনা বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে গত তিন মাস মাছ ও মাংসের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭২০-৭৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছের বাজারেও বড় কোনো হেরফের হয়নি। তিন মাস ধরেই রুই ২৫০-৪৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, পাঙাশ ১৫০-২০০ টাকা এবং কাতল ৩০০-৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গছিমাছ ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে অপরিবর্তিত আছে।
রংপুরের বাজারে চাল ও মুদি পণ্যের দাম গত তিন মাস প্রায় অপরিবর্তিত ও স্থিতিশীল। আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত স্বর্ণা (মোটা) চাল ৪৮-৫০ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৬০-৬৫ টাকা এবং মিনিকেট ৭৫-৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে তিন মাসে ২৫ কেজির চালের বস্তায় প্রকারভেদে ১৩০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২০৫-২১০ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ২০০-২২